ঢাকাTuesday , 23 June 2026
  1. অন্যান্য
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন আদালত
  5. আইন ও পরামর্শ
  6. আন্তর্জাতিক
  7. আবহাওয়া
  8. ইসলাম
  9. কর্পোরেট
  10. কৃষি
  11. ক্যাম্পাস
  12. ক্রিকেট
  13. খুলনা
  14. খেলাধুলা
  15. চট্টগ্রাম
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্কুলের নৈশপ্রহরীদের জীবন: ৩৬৫ দিনের নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব, তবুও নেই প্রাপ্য মর্যাদা

Link Copied!

বিশেষ প্রতিবেদন | BartaShindhu.com

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সবচেয়ে অবহেলিত একটি পদ হলো স্কুলের নৈশপ্রহরী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বছরের ৩৬৫ দিন রাত জেগে দায়িত্ব পালন করেন তারা। স্কুলের ভবন, শ্রেণিকক্ষ, অফিস, আসবাবপত্র, কম্পিউটার ল্যাব, লাইব্রেরি ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রক্ষায় তাদের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ তাদের জীবনসংগ্রাম, কর্মপরিবেশ এবং মানবিক সংকটের বিষয়গুলো খুব কমই আলোচনায় আসে।

অনেক নৈশপ্রহরীর অভিযোগ, বাস্তবে তাদের জন্য নির্ধারিত কোনো ছুটি নেই। সরকারি ছুটি, ঈদ, পূজা, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস কিংবা অন্য কোনো বিশেষ দিন—সব সময়ই তাদের কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হয়। যখন অন্যরা পরিবার নিয়ে উৎসব উদযাপন করেন, তখন তারা স্কুলের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন।

অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করলেও তারা নিয়মিত ছুটি বা বিকল্প কর্মীর সুবিধা পান না। ফলে কর্মজীবন একঘেয়েমি ও মানসিক চাপের মধ্যে কাটে।

অসুস্থ হলেও মিলছে না অব্যাহতি, সবচেয়ে কষ্টকর বাস্তবতা হলো, অসুস্থ অবস্থায়ও অনেক নৈশপ্রহরীকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। জ্বর, শারীরিক দুর্বলতা বা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হলেও অনেক সময় ছুটি নেওয়ার সুযোগ থাকে না। কারণ তাদের পরিবর্তে দায়িত্ব পালনের জন্য বিকল্প কর্মী নেই।

ফলে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়েও রাতভর টহল দিতে বাধ্য হন তারা। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়।

শুধু রাতের পাহারাদার হিসেবেই নয়, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈশপ্রহরীদের দিয়ে বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত কাজও করানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অফিসের কাজ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, অতিথি আপ্যায়ন, বাজার করা কিংবা অন্যান্য ব্যক্তিগত নির্দেশনাও পালন করতে হয় অনেককে।

অনেক নৈশপ্রহরীর ভাষ্য, “প্রধান শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষ যা বলেন, তাই করতে হয়। না করলে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।”

যদিও সব প্রতিষ্ঠান একই রকম নয়, তবে বিভিন্ন এলাকায় এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যায়।

বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে অনেক নৈশপ্রহরীর বেতন দিয়ে সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ব্যয় ও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। ফলে কেউ কেউ অতিরিক্ত আয়ের জন্য দিনে কৃষিকাজ, ক্ষুদ্র ব্যবসা বা শ্রমের কাজও করেন।

একদিকে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অন্যদিকে সীমিত আয়—এই দুইয়ের চাপে তাদের জীবন হয়ে উঠেছে সংগ্রামের আরেক নাম।

রাতের অন্ধকারে বিদ্যালয় পাহারা দেওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়। চোর, দুর্বৃত্ত, মাদকসেবী কিংবা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থাকে সবসময়। অনেক ক্ষেত্রে তারা একাই পুরো স্কুল প্রাঙ্গণের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।

তবে নিরাপত্তা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ বা ঝুঁকি ভাতার মতো সুবিধা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের নাগালের বাইরে।

রাতভর জেগে থাকার কারণে দিনের বেলায় বিশ্রাম নিতে হয়। ফলে সন্তানদের সময় দেওয়া, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা পারিবারিক আয়োজনে অংশগ্রহণ করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। পরিবারকে সময় দিতে না পারার কষ্ট তাদের নীরবে বয়ে বেড়াতে হয়।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও সম্পদ রক্ষায় নৈশপ্রহরীদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের অনেকেই এখনও পর্যাপ্ত বেতন, নিয়মিত ছুটি, চিকিৎসা সুবিধা এবং কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা থেকে বঞ্চিত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নৈশপ্রহরীদের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, অসুস্থতাজনিত ছুটি, ঝুঁকি ভাতা এবং মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি তাদের দায়িত্বের বাইরে অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে না দিয়ে পদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করাও সময়ের দাবি।

দিনের আলোয় শিক্ষার্থীরা যে স্কুলে স্বপ্ন বুনে, সেই স্কুলকে রাতের আঁধারে আগলে রাখেন নৈশপ্রহরীরা। তারা না থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেকটাই অরক্ষিত হয়ে পড়বে। তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের উচিত এই নীরব প্রহরীদের কষ্ট, ত্যাগ ও অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।